
`কুয়েটের গবেষকদের বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন প্রযুক্তি প্রদর্শন`। ছবি: সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক | মানবাধিকার কণ্ঠ অনলাইন
বাংলাদেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের প্রযুক্তি। মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট বর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের অবশিষ্টাংশ, রান্নাঘরের বর্জ্য এবং কৃষিজ উপাদানকে সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হলে একদিকে পরিবেশদূষণ কমবে, অন্যদিকে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা হ্রাসের সুযোগ তৈরি হবে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে গবেষণা, বিনিয়োগ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানোর দাবি উঠেছে।যদি এই প্রযুক্তি সফল হয় তাহলে বর্জ্যই হতে পারে সম্পদ।
গত শনিবার, ১০ অক্টোবর সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) গবেষকদের উদ্ভাবিত বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন প্রযুক্তির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় প্রকল্পটির কার্যক্রম, গবেষণার অগ্রগতি এবং বাণিজ্যিকভাবে তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অবহিত করেন গবেষকেরা। প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা বিবেচনায় প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রকল্পটির গবেষক কুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান মানববর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্য, রান্নাঘরের বর্জ্য ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশ থেকে জ্বালানি তেল তৈরির প্রযুক্তিগত দিক তুলে ধরেন। প্রায় এক দশক ধরে পরিচালিত এ গবেষণায় ‘হাইড্রোথার্মাল লিকুইফ্যাকশন’ (এইচটিএল) প্রযুক্তি ব্যবহার করে জৈব অপরিশোধিত তেল বা বায়োক্রুড উৎপাদনে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষাগারে এ প্রযুক্তিতে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বায়োক্রুড উৎপাদনের ফল পাওয়া গেছে। বাণিজ্যিক উৎপাদনের উপযোগিতা যাচাই করতে পরবর্তী ধাপে পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বর্জ্যই হতে পারে সম্পদ
বাংলাদেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হয়। এসব বর্জ্যের একটি অংশ যথাযথভাবে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত না হওয়ায় নালা-নর্দমা বন্ধ হওয়া, জলাবদ্ধতা, দুর্গন্ধ এবং মাটি ও পানিদূষণের মতো সমস্যা দেখা দেয়। কোথাও কোথাও খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলা বা পোড়ানোর কারণে বায়ুদূষণও বাড়ে।ফলে মানুষের শরীরে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে বর্জ্যকে শুধু অপসারণের উপাদান হিসেবে না দেখে সম্ভাবনাময় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। উপযুক্ত প্রযুক্তির মাধ্যমে বাছাই করা বর্জ্য থেকে জ্বালানি উপাদান উৎপাদন করা গেলে বর্জ্যের চাপ কমানোর পাশাপাশি নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে।এছাড়া অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় যত্রতত্র পড়ে থেকে দূষণ ছড়ানোও কমে আসবে।
তবে সব ধরনের বর্জ্য একই প্রযুক্তিতে প্রক্রিয়াজাত করা যায় না। বিশেষ করে প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের জন্য প্লাস্টিকের ধরন অনুযায়ী পৃথক প্রক্রিয়া ও নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন। তাই মানববর্জ্য, কৃষিজ অবশিষ্টাংশ, পচনশীল বর্জ্য এবং প্লাস্টিককে আলাদা করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিতে হবে।
সাশ্রয় হতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানির দাম বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়। এ অবস্থায় দেশীয় গবেষণার মাধ্যমে বিকল্প জ্বালানি উৎপাদনের প্রযুক্তি বিকশিত করা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বায়োক্রুড পরিশোধন ও প্রয়োজনীয় মান যাচাইয়ের পর কতটা ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর করা যায়, তা নির্ধারণ করতে হবে। প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে সম্ভাব্য উৎপাদন, ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পরিমাণ নির্ভর করবে প্রযুক্তির কার্যকারিতা ও বাণিজ্যিক বাস্তবতার ওপর।
প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা
এই সম্ভাবনাময় খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে নিতে সরকারের সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপন, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগ এবং বেসরকারি বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদিত তেলের গুণমান, পরিবেশগত প্রভাব, বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যয় ও শিল্পপর্যায়ে ব্যবহারের উপযোগিতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।
প্রকল্পের পরবর্তী ধাপে প্রযুক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি বাণিজ্যিক লাভজনকতা নিশ্চিত করতে হবে। বর্জ্য সংগ্রহ ও পৃথকীকরণের কার্যকর ব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদনপ্রক্রিয়া এবং যথাযথ বর্জ্য অবশিষ্টাংশ ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের এ উদ্যোগ সফল হলে বাংলাদেশ একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি নিরাপত্তায় অগ্রগতি অর্জনের সুযোগ পাবে। তাই কুয়েটের গবেষকদের এ উদ্যোগকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় কারিগরি, আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা দেওয়া সময়োপযোগী পদক্ষেপ হতে পারে। পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের মাধ্যমে বর্জ্যকে বোঝা থেকে সম্পদে রূপান্তর করা গেলে দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশ উভয়ই উপকৃত হবে।





